হারিয়ে যাচ্ছে তালের কোন্দা, এখন শুধুই স্মৃতি

ফয়সাল আহমেদ: “দেরিতে হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে রূপগঞ্জে। ঢাকার অতি সন্নিকটে হলেও এতদিন অবহেলিতই ছিল রূপগঞ্জ। রূপগঞ্জেই তৈরি হচ্ছে আধুনিক সুযোগ সুবিদাসহ স্যাটেলাইট শহর। আর এ শহরকে ঘিরেই বিভিন্ন আবাসন কোম্পানীগুলো হুমরী খেয়ে পড়েছে রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়।

নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন আবাসন কোম্পানীর বালি ভরাটের কারণে কেটে ফেলা হচ্ছে অক্সিজেনের ফ্যাক্টরীগুলো (গাছ)। পরিবেশবান্ধব ও বর্জ্রপাত প্রতিরোধক তাছ গাছগুলোও কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। আর তাল গাছেই তৈরি হতো এক সময়ের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য কোন্দা।

নগরায়নের যুগে ক্রমবর্ধমান মানুষের আবাসন সঙ্কট নিরশনের জন্য যেমন গ্রামছে গ্রাম বালি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে, তেমনি গ্রামের বনভূমিও ঊজাড় করা হচ্ছে। গ্রামের বাড়ির পাশে, রাস্তার দুই ধারে, বিলের পাশে সারি সারি তালগাছ কতই না সুন্দর দেখা যেত। এখন সেই তাল গাছও নেই, নেই প্রাকুতিক শিল্পী, নিপুন কারিগড় বাবুই পাখি, নেই ঐতিহ্যবাহী তালের কোন্দা নৌকা।” এমনি করে কথাগুলো বলছিলেন কাঞ্চন পৌর এলাকার রানা মিয়া।

তালের কোন্দা নিয়ে প্রশ্ন করতেই মুশুরী এলাকার আব্দুল বাতেন মিয়া বলেন, “লেখেন বাজান, বেশি বেশি করে রূপগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে লেখেন। যতই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে আর আমরা হারিয়ে যাচ্ছি বাজান। আমাদের বাপদাদার ভিটা থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রও করছে এক শ্রেণির অসাধু আবাসন কোম্পানীর লোকেরা।”

কালের আবর্তনে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে রসালো ফল তাল গাছ। এক সময় গ্রামাঞ্চলে প্রচুর তাল গাছের দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য দেখা যেত। উপজেলার মানুষ এক সময় তাল গাছের বাগান করে রাখতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাল গাছের বাতাসে পাতার ফত ফত শব্দ শুনা যাচ্ছে না। প্রতি বছর বর্ষার মৌসুম আসতে না আসতেই দেখা যেতো গোড়া সহ তাল গাছ তুলে তা দিয়ে তৈরি করা হয় নৌকার বিকল্প তালের কোন্দা।

রূপগঞ্জে এক সময় সর্বত্র চোখে পড়তো তাল গাছ দিয়ে তৈরি কোন্দা। তালের এই বিশেষ নৌকা ছিল গ্রামের লোকজনের যাতায়াতের অন্যতম বাহন। এখন আর কোন্দা তেমন দেখা যায় না। বলতে গেলে হারিয়ে যেতে বসেছে এই নৌকা। এলাকাভেদে এর নাম আবার ডোঙ্গা হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, আগে এসব এলাকায় বর্ষা হতো। বিলে ঝিলে পানি থাকত সারা বছর। বাড়ী থেকে হাট বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল তালের কোন্দা।

দুই তিনজনের পারাপার, মাছ ধরা, ধান কাটা, শাপলা তোলা, শামুক সংগ্রহ, বিল বাঁওড় পুকুরে মাছের ঘেরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো তালের কোন্দা।রূপগঞ্জ সদর উপজেলার কেন্দুয়া, ইছাপুরা, পর্শি, বাগবের, দক্ষিণবাঘ, বোচারবাঘ, নাওড়া, কেড়াব, কুসাব, বর্তমান পুর্বাঞ্চলখ্যাত এলাকাসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বিল এলাকার বিভিন্ন গ্রামে কোন্দার ব্যবহার চোখে পড়তো। তালের কোন্দার বাইচ প্রতিযোগিতা গ্রাম বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা ছিল।

স্থানীয় কোন্দা তৈরির কারিগররা জানান, তাল গাছের আধিক্যের কারণেই অঞ্চলে এক সময় প্রচুর কোন্দা তৈরি হতো। কোন্দা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করত অনেক লোকজন। বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন এখানে আসতেন কোন্দা কিনতে। কেউ কারিগর নিয়ে বাড়ির উঠানে তৈরি করতেন তালের কোন্দা। তিন প্রজন্মের এই পেশা সস্পর্কে উপজেলার কেড়ার গ্রামের নায়েব আলী ছৈয়াল বলেন, তিনি এই কাজ শিখেছেন তার বাবার কাছ থেকে।

তিনি আরো বলেন, এক সময় এ এলাকায় প্রচুর তাল গাছ ছিল। ফলে এসব এলাকায় বেশি কোন্দা তৈরি হতো। নানা সংকটে কারিগররা হারিয়ে গেছে, সেই সাথে কোন্দাও। এখনও দু-এক জায়গায় চোখে পড়ে কোন্দা।নায়েব আলী ছৈয়াল বলেন, ১৫/২০ বছর বয়সী একটি তাল গাছ থেকে দুটি কোন্দা তৈরি করা যায়। কোন্দার মাথা বিভিন্ন নকশা করে তৈরি করা হয়। একেকটি বিক্রি হতো তিন থেকে চার হাজার টাকায়। আর গাছ কেনা যেতো চার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়।

ভালো গাছের কোন্দা ৮-১০ বছর ব্যবহার করা যেতো। বর্ষা চলে গেলে কোন্দা পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হতো। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত কোন্দা বেশি বিক্রি হতো। এটি পরিবেশ বান্ধব ও সহজ নৌযান। এ ধরনের নৌযান টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন ছিল।একটি কোন্দা তৈরি করতে মিস্ত্রীদের সময় লাগ ৪/৫দিন। রূপগঞ্জ উপজেলার রূপগঞ্জ সদর, দাউদপুর, পুটিনা, ভোলাব, গোলাকান্দাইল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় প্রচুর পরিমানে বাড়ি ও সড়কের পাশে তাল গাছের দেখা মিলতো।বাবুই পাখি তাল গাছের পাতার নিচে নিপুন বুনুনে বাসা তৈরি করতো।

হাউজিং কোম্পানীগুলোর দাপটের কারণে বালি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে নিম্মাঞ্চল। আবাসন তৈরি করার জন্য কেটে ফেলা হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব , বর্জ্রপাত প্রতিরোধক তালগাছ। তাল গাছ কেটে ফেলার কারণে এখন বাবুই পাখির বাসাও চোখে পরে না। এভাবে তাল গাছ কেটে উজার করার ফলে ব্রজ্যপাতে মানুষ মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকই বলেন।

বয়োজেষ্ঠ্যরা বলেন, আগে বজ্রপাত হলে উচু গাছ হওয়ায় তা তাল গাছে বেশি পরতো। আর এখন তাল গাছ কেটে উজার করে দেয়ার কারণে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। তাই গাছ লাগিয়ে পরিবেশ বাচাঁনো প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *