নারী মুক্তির জন্য দায়সারা শুভেচ্ছা বিলানোই যথেষ্ট নয়

নূরুল আলম আবির : নারী মুক্তির জন্য শুধু দায়সারা শুভেচ্ছা বিলানোই যথেষ্ট নয়।আমি নারীর প্রতি সম্মান দেখাইলাম,নারীর সর্বাঙ্গীন উন্নতি কামনা করলাম।পরক্ষণেই আমি আবার নারীর ঘর দখল করে তার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়ে,তাকে দূরের কোনো জঙ্গলে থাকার ছোট্ট একটা কু্ড়েঘরের ব্যবস্থা করলেই আমার দায়িত্ব শেষ নয়।আপনার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিল।তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আপনি আর আপনার পরিবারের সদস্যরা পিতার সেবাযত্ন করার ক্ষেত্রে অপারগ হয়ে গেলেন।

বেচারা বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে,এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তি হয়ে কারো কাছে লজ্জায় সে কথা বলতেও পারলেন না।শেষমেশ পিতাকে আরো একটা বিয়ে করার জোর প্রচেষ্টা চালালেন।অসহায় বৃদ্ধ সম্মানিত মানুষটিও চিন্তা করে দেখলেন তাকে বিয়ে না করলে নিজের খাবার নিজেই রান্না করে খেতে হবে।নিজের সেবা শুশ্রূষার জন্য ছেলেমেয়ে,ছেলেবউ ও নাতিপুতিদের অভাব না থাকলেও একটা মানবরূপী প্রাণীও তাঁকে উঁকি দিয়ে দেখতে চায় না।

লোকটি খায় কি খায় না,সুস্থ কি অসুস্থ-তার খবর কেউ নিচ্ছিল না।এমতাবস্থায় আরেকটা বিয়ে করলে তাঁর কোনো অপরাধ হবার কথা নয়।সেটাকেও আপনি এবং আপনারা অপরাধ হিসেবে নিলেন।তারপর নিজের হেলেপড়া বৃদ্ধ জীবনের সঙ্গী হবার জন্য একজন হতভাগীকে বিয়ে করলেন সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা।প্রথম প্রথম সব ভালোই চলছিল।একমাস,দুই মাস,এক বছর দুই বছর পর বাবার শেষ স্ত্রীর সাথে পুরো পরিবার দুশমনি শুরু করে দিল।

নিজের ছেলে ও ছেলেবউদের গ্রাম্য সালিশ ডেকেও মানাতে না পেরে ক্ষোভে দুঃখে তিনি নিজের বউকেই মাঝেমধ্যে মারতেন,উল্টো শাসন করতেন।যদিও মারতেন বউকেও তিনি ভালোবাসতেন জীবন দিয়ে।কারণ ওই মেয়েটাই তার জীবনের একমাত্র আলো আশা,বেঁচে থাকার নিভু নিভু প্রদীপ।ভালোমন্দে সময় কেটে গেল ৮/৯ বছর।অসুস্থতায় ভোগে সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা একদিন মারা গেলেন।থেকে গেলেন একা তার সেই হতভাগা বউ ও একমাত্র ছেলেটা।

তাঁর মৃত্যুর ৭ দিনের মাথায়ই নিজেদের ছোট মাকে,তার কোলের একমাত্র শিশু ছেলেসহ বিদায় করতে উঠেপড়ে লেগে গেল ৯ ছেলেমেয়ে ও ছেলের বউসহ নাতিপুতিরা।তাকে কৌশলে তাড়াতে না পেরে কোলের শিশুসহ তাকে একরকম লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয়।তখন সে একটা ঘোয়াল ঘরে আশ্রয় নেয়।এরপর ওই মুক্তিযোদ্ধার হতভাগ্য স্ত্রীর জীবনে ঘটে অতীব দুঃখজনক করুণ পরিণতি।সে স্বামীর বাড়ির লোকজনের অত্যাচারে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

অবশেষে এক গভীর রাতে সেই মেয়েটি অতীব ক্ষোভ ও বারংবার ফুঁসে উঠা দুঃখের অনল সইতে না পেরে, নিজেই নিজের গায়ে আগুন দেয়।তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়।আগুন লেগে মারাত্মকভাবে আহত হবার পর সে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেয়।এই হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধা স্ত্রীকে যারা নিজের হাতে খুন করল,তারাও নারী দিবসে নারীর সত্যিকারের মুক্তির জন্য দায়সারা শুভেচ্ছা বিলিয়েছে।নারীদের জীবনের সীমাহীন উন্নতি ঘটুক বলে শুভ কামনা জানিয়েছে।এসব ভয়ানক পশুরাই আজকের এই আধুনিক যুগে নারীদের এগিয়ে চলার পথে প্রধান বাঁধা।

সেই মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর দিন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমাণ্ডার তাঁর জানাযায় এসে,জানাযায় উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে,প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার জীবনের অমর কীর্তির অশ্রুসজল বিবরণ দিলেন।তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি কেন পেলেন না,তার জন্যও গভীর দুঃখ প্রকাশ করলেন।একাত্তরে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধে প্রাণপ্রিয় সহযোদ্ধাদেরকে নিজ ঘরে আশ্রয় দেয়ার কথা,নিজ জমি বিক্রি করে তাঁদেরকে খাওয়ানোর কথা এবং কিভাবে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন তার বীরোচিত ভূমিকার কথা কমাণ্ডার সাহেব নিজের মুখেই প্রিয় সহযোদ্ধার বীরোচিত জীবনের স্মৃতিচারণ করলেন।

উপস্থিত প্রায় সকলেরই চোখে জল এল।আমারো চোখের কোঠর ভরে এলো ব্যথাভরা নোনাজলে।এরপর দাফন কাফন শেষে মাটি চাপা পড়ে গেল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরোচিত জীবন উপাখ্যানের অমর কীর্তি।তাই বলছিলাম,নারীদের প্রতি একদিনের দায়সারা শুভেচ্ছা বার্তা বিলি করলেই নারী মুক্তি আসবে না।সমস্যার গভীরে গিয়ে আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে,দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রতিটি নারী নির্যাতনের ঘটনার গহীনের মূল রহস্য উদঘাটন করে,ঘটনার সাথে জড়িত প্রধান প্রধান খলনায়ককে জনসম্মুখে জুতাপেটা করে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে।অপরাধীকে বের করে আনার আইনের যত ফাঁকফোকর সব বন্ধ করে দিতে হবে।ধর্ষণ বা যেকোনো নারী নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী অফিসারকেও হতে হবে নারী বান্ধব,ঘুষ বিমুখ,অপরাধ বিমুখ,মানবিক ও ইনসাফ পূর্ণ মানসিকতার।

কোনোভাবেই কেউ যেন সঠিক তদন্ত কাজে বাঁধা হতে না পারে,সে দিকে খুবই সূক্ষ্ম ও নিবিড় নজর রাখতে হবে।অন্যায়কারীকে ছাড়া দেওয়ার ভয়ানক সব অপকৌশলকে ব্যর্থ করে দিতে।কোনো নির্যাতিত নারী বা কোনো সাধারণ মানুষের বিচার প্রাপ্তির পথে থাকা সকল বাঁধা চূর্ণ করে আনতে হবে সত্যিকারের নারী মুক্তি,মানবতার মুক্তি।তবেই পরপারে শান্তি পাবে একাত্তরে অকাতরে জীবন দেয়া বীর শহীদদের পবিত্র আত্মা।পূরণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার পরম আকাঙ্খিত স্বপ্ন।

লেখক : শিক্ষক,সাহিত্যিক,সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *