বেকার প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কোথায়?

জোবায়ের জুবেল : আজ থেকে ৫০ বছর আগের পৃথিবী এতো কঠিন ছিলো না।আমাদের বাবাদের যুগে পাঠশালার পাশেই ভালো চাকরি পাওয়া যেতো৷দাদারা তো কেবল টিপসই দিয়েই সরকারি চাকরি নিয়ে নিতেন। এখন সময় বদলেছে,সবকিছু আর আগের মতো সহজ নেই।তখনকার যুগে সারা গ্রাম ঘুরে একজন ম্যাট্রিক পাশ ছেলে খুঁজে পাওয়া যেতো না।এখন তো ঘরে ঘরে সবাই গ্রাজুয়েটেড।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী,১৯৭১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিলো ১৬.৮ শতাংশ যা এখন ৬১ শতাংশে উপনীত হয়েছে।শিক্ষার হার বাড়লেও বাড়েনি উপযুক্ত কর্মসংস্থানের হার।ফলে দেখা দিয়েছে বেকারত্বের করুণ পরিস্থিতি।আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আই.এম.এফ) এর মতে,কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি ধারাবাহিকভাবে ছয় মাস ২ দশমিক ৫ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি সংকোচিত হয়,তখন তাকে অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্যদিকে,বেকারত্ব বলতে অর্থনীতির ঐ অবস্থাকে বোঝানো হয় যখন কোনো দেশের বহু সংখ্যক সুস্থ, কর্মক্ষম মানুষ কাজের সন্ধান করেও প্রচলিত মজুরীতে কাজ পায়না।তবে, ২০০২-২০০৩ এবং ২০০৫-২০০৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপে,১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের এমন ব্যক্তিকেও বেকার বিবেচনা করা হয়েছে যে সক্রিয়ভাবে কাজের সন্ধান করা সত্ত্বেও কোন কাজ করেনি।বাংলাদেশে সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ হয়েছে ২০১৭ সালে।

সেই জরিপ অনুযায়ী,দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ৬ কোটি ৩৫ লাখ।তাদের মধ্যে কাজ করেন ৬ কোটি ৮ লাখ নারী-পুরুষ অর্থাৎ বেকার ২৭ লাখ আর শতাংশ হিসাবে এই হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ।ঐ জরিপ অনুযায়ী,বাংলাদেশে যারা কাজ করেন,তাদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যক্তিগত অংশীদারত্ব অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য উদ্যোগের ভিত্তিতে কর্মক্ষম হয়েছেন।গৃহস্থালি পর্যায়ে কাজ করেন ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

সরকারী পর্যায়ে মাত্র ৩ দশমিক ৬ এবং এনজিওতে দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।গত দেড় দশকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়েনি।শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী,২০০২-০৩ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছরের মধ্যে প্রতিবছর ২ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে কর্মসংস্থান বেড়েছে।পরের পাঁচ বছর বাড়ার হার ছিলো ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

২০১০ সালের পরের তিন বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ হারে এবং ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তা কমে ১ দশমিক ৩০ শতাংশে নেমে যায়।অর্থাৎ ২০০২-২০১০ সালের মধ্যে দেশে গড়ে প্রতিবছর ১৪ লাখ আর ২০১০- ২০১৭ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে সাড়ে ৯ লাখ নতুন চাকরি হয়েছে।উক্ত পরিসংখ্যানেই এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ হলেও তা কর্মসংস্থানহীন।২০১৯ সালে বিআইডিএসের গবেষণায় পাওয়া তথ্য মতে, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।

বাকিদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ সার্বক্ষণিক চাকরিতে এবং ১৮ দশমিক ১ শতাংশ খণ্ডকালীন কাজে নিয়োজিত।জরিপের তথ্যমতে,শিক্ষা শেষে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত বেকার ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, দুই বছরের চেয়ে বেশি সময় ধরে বেকার ১৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ,ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বেকার ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বেকার যুবকদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারী।করোনাকালে যা আরও ভয়ংকর রূপ ধারন করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী,দেশে লকডাউনের সময় বেকারত্বের হার দশ গুণ বেড়ে যায়।বর্তমানে দেশে গরিব মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটিরও বেশি।এদেরকে টেনে তুলতে হলে প্রয়োজন উপযুক্ত কর্মসংস্থান।বেকারত্বের কারণে সমাজে চুরি,ছিনতাই, সন্ত্রাসের পরিমাণ বেড়ে যায়।প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়েই অনেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।কাজেই এখন থেকেই এই দূর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে।জাতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

লেখক : সম্পাদক, স্বর্ণলিপি প্রকাশনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *