প্রবাসীদের কান্না কেউ দেখে না

নূরুল আলম আবির : বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের ভেতর কিংবা প্রবাসে প্রতিনিয়তই হয়রানির শিকার হচ্ছে।পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে ভিসা প্রাপ্তি,টিকেট প্রসেসিং,কাজে বৈধভাবে যোগ দেওয়ার কাগজপত্র প্রাপ্তি সহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অবর্ণনীয় অবজ্ঞা,অবহেলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।দেশের ভেতর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং দেশের বাইরে সরকারের দূতাবাসগুলো সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।একজন প্রবাসী বিপদে পড়লে দেশের বাইরে প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় না।

কোনো প্রবাসী ভাই মারা গেলে নিজেরা চাঁদা উঠিয়ে দেশে লাশ পাঠাতে হয়।তারপরও বহুদিন ধরে প্রসেসিং এর নামে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। এক মাস দুই মাস পর স্বপ্ন ফিরে বাড়িতে,ব্যথাতুর লাশ হয়ে!সঠিকভাবে সুন্দরভাবে প্রবাসীরা কঠিন এই বিপদের সময়ও সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পায় না।বহু রেমিট্যান্স যোদ্ধা মালিকের অত্যাচার ও নিপীড়নের শিকার হলে প্রয়োজনীয় আইন সহায়তা পায় না।

মালিক ঠিকমত বেতন না দিলে,তা আদায়ে তাদের পক্ষে কথা বলার মত কেউ থাকে না।এই করোনাকালীন সময়েও ছুটিতে আসা বা নতুন করে বিদেশে যাওয়া স্বপ্ন শিকারী মানুষগুলোর দিকে তাকালে অশ্রুসজল রাশি রাশি ব্যথায় কাতর কাজল আঁখি আপনার মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠবে।কিছু চেনা মুখ আপনাকে বলবে,আমরা সময়মত পাসপোর্ট পাচ্ছি না।ভিসা থাকলেও টিকেট প্রসেসিং সমস্যার কারণে আটকা পড়ে আছি।ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে এলেও কারো কোনো দায় দায়িত্ব নেই।

কিছু অচেনা মলিন মুখ বলবে,ইস্ আমি যদি বাংলাদেশী না হতাম!তাহলে দেশে বা বিদেশে কোনো হয়রানিই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না।পাসপোর্ট অফিসে দালাল থাকত না।পরীক্ষা না করেও পরীক্ষা করেছে বলে মিথ্যা সার্টিফিকেট নিয়ে বিদেশে গিয়ে করোনা ধরা পড়ে আবার দেশে ফিরতে হতো না।বুকের গহীনে লালন করা অগনিত অজস্র সুন্দর স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হতো না।বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে রেড এলার্ট থাকলেও কিছু ভালো মানুষের মুখোশ পরা প্রতারক বিদেশে পাঠাতে পারবে বলে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রবাসীদের কাছ থেকে।

বিদেশে যেতে না পেরে টাকা মেরে দেওয়া লোকটার পিছনে ঘুরতে ঘুরতে বহু প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।শেষ হয়ে যায় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটিও।আপদকালীন সময়ে জমাকৃত শেষ পুঁজির টাকাগুলো হারিয়ে দিশাহীন বহু রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসে না।বরং গলা উঁচিয়ে বহু ভণ্ডকে বলতে শোনা যায়,সকল অপরাধ ঐ প্রবাসী লোকটারই!সে কেন ভণ্ড প্রতারককে টাকা দিল? সেকি মানুষ চিনে না?সে টাকা না দিলে তো প্রতারিত হতো না! আর জেনে-বুঝে দেবে তো!শতকরা ১০% লোকও বলে না প্রবাসীর গলায় চুরি বসানো লোকটার অপরাধের কথা।

বরং তারা দাপটধারী ভণ্ড লোকটার পক্ষে কথা বলে অসহায় প্রবাসীদের ধমকের পর ধমক দিয়ে যায়।সমাজসেবক,জনপ্রতিনিধি,রাজনীতিবিদ সহ আরো কত তকমা লাগানো ভদ্দরবেশী কিছু মানুষ স্বীকার করে না দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জীবন দিয়ে কাজ করে যাওয়া প্রবাসী সূর্য সন্তানদের মহামূল্যবান অবদানের কথা।পিতামাতা,পরিবার পরিজন,কলিজার টুকরো খোকাখুকু ও প্রাণের চেয়েও প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকে আকাশ পথে দেশ ও পরিবারের জন্য স্বপ্ন,সুখ ও সমৃদ্ধি পাঠানো লোকগুলো সবার কাছে অবহেলিতই থেকে যায়।

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।বর্তমানে করোনাভাইরাস মহামারির চলমান সংকটের মধ্যেও প্রবাসীদের রেকর্ড পরিমাণ আয়ের ধারা অব্যাহত রয়েছে।যা সত্যিকার অর্থেই অবিশ্বাস্য!প্রতিনিয়ত এ ধারা অব্যাহত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশি ভাইবোনেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে,২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেকর্ড ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠায় প্রবাসীরা।এরপর আগস্টেও ১৯৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স আসে বাংলাদেশে।শুধু তা–ই নয়,সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স দুই বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছায় ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলারে।সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসীরা ৬৭১ কোটি ৩১ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন।২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪৫১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার।এ হিসাবে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ৪৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।দেশের মোট জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো,যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

দেশের গৌরব গাঁথা অর্জনে যাদের অবদান অপরিসীম,তাদের খবর ক’জন রাখে?সব সময় মনে প্রশ্ন জাগে,আসলে যে দেশের উন্নয়নে নিজেদের অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছেন প্রবাসী স্বপ্ন সেনানীরা,সেই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ থেকে বিনিময়ে তারা কি পাচ্ছেন?দিন শেষে হিসাবের খাতা খুলে বসলে দেখা যাবে— অবশিষ্ট বলতে আর কিছুই নেই।প্রাপ্তির থলেটা কেবল শূন্যই পড়ে রয়!অদৃশ্য শিকলে হাত দুটো যেন বাঁধা পড়েছে তাদের।

একজন প্রবাসী দিনরাত পরিশ্রম করে নিজের জীবনকে বিসর্জন দিয়ে পরিবার ও দেশের সুখ কিনতে পাড়ি জমাচ্ছেন দূর প্রবাসে।অথচ দেখা যায় পরিবার ও প্রিয় জন্মভূমিকে সুখে রাখতে গিয়ে নিজেই সুখের আগল থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন।সীমাহীন কষ্টকে আলিঙ্গন করে দূর প্রবাসে পড়ে থাকেন বছরের পর বছর।তবু কেবল প্রবাসী ভাইবোনদের চোখেমুখে একটাই স্বপ্ন ভেসে বেড়ায়— ভালো থাকুক পরিবারের প্রিয় মানুষগুলো,ভালো থাকুক সুন্দর আগামীর সোনার বাংলা।

মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ২৫ লাখ প্রবাসী ভাইবোন কর্মরত আছেন।সৌদি আরবে রয়েছে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী। তাদের সংখ্যা প্রায় ১দশমিক ২মিলিয়ন। এ ছাড়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইন, জর্ডান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, কোরিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা আছেন।অথচ কষ্টের সুরেই বলতে হয়,কেমন আছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা?দেশে স্বপ্ন পাঠানো,সুখ পাঠানো রেমিট্যান্স সৈনিকেরা?ভালো–মন্দের এ খবরটুকু রাখার মতো ক’জন মানুষই–বা আছেন বাংলাদেশে?যেসব মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে মাতৃভূমি ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে চলে গেলেন,তাঁদের খবর রাখার কি কোনো প্রয়োজন নেই রাষ্ট্রের?

রাষ্ট্র তাদের খোঁজ-খবর ঠিকমত রাখলে,দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রবাসীরা সর্বস্ব হারাত না।নামে বেনামে প্রতিষ্ঠিত হওয়া রাকিব উদ্দিনদের কম্পিউটার দোকান,ট্রাভেল এজেন্সিগুলো প্রবাসীদের কলিজা ছিড়ে খেতে পারত না।যদিও কিছু ভালো ও প্রতিশ্রুতিশীল ট্রাভেল এজেন্সি বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।সরকারের উচিত ভালো ও বিশ্বস্ততার সুনাম বহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্বিক সুবিধা দিয়ে সহায়তা করা।আর ভণ্ড ও প্রতারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রবাসীদের স্বপ্ন চুরি করা চোরাবালির মত খারাপ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থা করা।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ফোন নাম্বার চালু রেখে অতিজরুরী আইনি সেবা প্রদান করা।বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে।প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যথাযথ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা গেলে এ খাতে আরো অধিকতর ও উল্লেখযোগ্য হারে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।আমাদের দেশের ভেতর এত বিশাল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান একরকম অসম্ভব।আমরা যদি সঠিক উপায়ে জনশক্তি রপ্তানি করতে পারি এবং বিদেশের মাটিতে তাদের যথাযথ সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা দিতে পারি,তবে আমাদের অর্থনীতির চাকা হবে আরো সচল,আরো গতিশীল।আমরাই জয় করবো পৃথিবীর গৌরবান্বিত উচ্চাসন।

লেখক : কবি,সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *