অ্যাসাইনমেন্টের নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা,সর্বস্বান্ত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক

জিহাদ হোসাইন :করোনা দুর্যোগকালীন সময়েও থেমে নেই লক্ষীপুরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে মাসিক বেতন,পরীক্ষার ফি ও অ্যাসাইনমেন্টের নাম করে।বিভিন্ন উপায়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে।

লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ,রায়পুর,রামগতি,কমলনগর ও সদর উপজেলাসহ নবগঠিত চন্দ্রগঞ্জ থানাধীন কিছু সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়,এসব প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রকম নিয়ম-নীতি না মেনে মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি ও অ্যাসাইনমেন্ট বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ হাতিয়ে নেয় লক্ষ লক্ষ টাকা।

বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে ৮০০শ থেকে ৯০০শ জন ছাত্র/ছাত্রী রয়েছ বলে জানা যায়।জন প্রতি ৯৫০ টাকা থেকে শুরু করে ১১৯০ টাকা পর্যন্ত পরীক্ষার ফি ও অ্যাসাইনমেন্টের নামে করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে।প্রায় ৭ লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ যে অর্থ সরকার দিয়ে থাকে তাকে ইংরেজিতে বলা হয় মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার বা এমপিও।যদিও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেগুলো এমপিওভুক্ত।তবুও কোনো নিয়মনীতি মানতে নারাজ এসব প্রতিষ্ঠান।এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা হতদদরিদ্র।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল অনুযায়ী এই সহায়তা দেয় সরকার।সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন পান একটি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা।তাতে প্রধান শিক্ষকের বেতন দাড়ায় ২৯ হাজার টাকা। একজন সাধারণ শিক্ষকের বেতন ১৬ হাজারের মতো।

এর বাইরে রয়েছে বাড়িভাড়া হিসেবে এক হাজার টাকা, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা।ঈদ উৎসব ভাতা শিক্ষকদের জন্য বেতনের ২৫ শতাংশ আর কর্মচারীদের জন্য বেতনের ৫০ শতাংশ।পহেলা বৈশাখেও একই পরিমাণে উৎসব ভাতা দেয়া হয়ে থাকে।

সদর উপজেলার রসুলগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, পৌর শহরের লক্ষীপুর আদর্শ সামাদ উচ্চ বিদ্যালয়, লক্ষীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যানিকেতন, রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তর চরবংশী জয়নালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, চরলক্ষী জনতা উচ্চ বিদ্যালয়, দক্ষিণ চরবংশী এল,কে,এইচ উপকূলীয় উচ্চ বিদ্যালয়, চরবামনী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, রামগঞ্জ উপজেলার শাহজকি উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্র একই রকম দেখা গেছে।

রাখালিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি দেবনাথ বলেন,’উপর থেকে নির্দেশ আছে তাই নিয়েছি।’কোথায় বলা হয়েছে টাকা নেওয়ার জন্যে?সুদুত্তরে তিনি আরো বলেন,-‘শিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন, “দৈনিক শিক্ষার” ফেসবুকে দেখে টাকা নিয়েছি।’ ফেসবুকে এই নির্দেশনা কে দিয়েছে জানতে চাইলে মৃনাল কান্তি দেবনাথ বলেন-‘এটা শিক্ষামন্ত্রীর প্রজ্ঞাপন ছিল। আমাদের শিক্ষকদের বেতন দেয়ার জন্য আমরা টিউশনি ফি, অনলাইন ক্লাসের টাকা নিয়েছি।

রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশীর এল,কে,এইচ উপকূলীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান টাকা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন-‘এটা উপর থেকে নির্দেশ আছে নেয়ার জন্য, তাই নিয়েছি।মিজানুর রহমান বলেন-‘আমার অফিসে আসেন সামনাসামনি কথা বলি, ভাইজান।এক জবাবে তিনি আরো বলেন-টাকা নেয়ার বিষয়ে আমার কাছে প্রজ্ঞাপনের চিঠি আছে। অফিসে আসলে সব দেখাতে পারব।’

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন, পরীক্ষার ফি ও অ্যাসাইনমেন্টের নামে টাকা নেয়ার বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল মতিন বলেন-‘টাকা নেয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে কোন প্রজ্ঞাপন বা চিঠি আসেনি।তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে টাকা না নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। যদি তারা টাকা নিয়ে থাকে তাহলে এবিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড কুমিল্লার চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ আব্দুস সালাম মুঠোফোনে সংবাদ কর্মীদের জানান,করোনার এই দুর্যোগকালীন সময়ে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবুও যদি কেউ বেতন ও পরীক্ষার ফি বা অ্যাসাইনমেন্টের নামে টাকা নেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আলাপকালে তিনি আরো জানান, ‘জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি দেয়া হয়েছে, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা না নেয়ার জন্যে। তবুও আমি যখন জানতে পেরেছি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে সরকারি আদেশ, গেজেট, বিজ্ঞপ্তি এবং পরিপত্র সূত্রে জানা যায় গত ৬ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনে টিউশন ফি গ্রহণ না করা প্রসঙ্গে প্রজ্ঞাপন জারি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। যার স্বারক নং- ৩৭.০২.১০০০.০০০.১১.৯৯.২০/৬৪৮(২)। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাসাইনমেন্ট চলাকালীন পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত কোনো অর্থ বা ফি শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে গ্রহণ না করার বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *