নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য মূল্যের উর্ধ্বগতি অবশ্যই থামাতে হবে

মো: নূরুল আলম : পেঁয়াজের কেজি ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা, আলু ৫০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা! কোনো সবজির মূল্যই পঞ্চাশ টাকার নিচে নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের এমন উচ্চ মূল্যে বাজারে যেন আগুন জ্বলছে। খেটে-খাওয়া, দিনমজুর, রিকশা-সিএনজি-অটো চালক, প্রান্তিক কৃষক সহ সাধারণ মানুষ এমন উচ্চ মূল্যের বাজারে গিয়ে হাহাকার সাথে করে বাড়ি ফিরছে। একটা কিনতে পারলে অন্যটা না কিনে মাথায় হাত দিয়ে চিন্তা করছে, বউ ছেলেমেয়েসহ না খেয়ে মরতে হবে নাতো!

মাছে ভাতে বাঙালির প্রধান চাহিদা চালের বাজারও অস্থিতিশীল। দেশে প্রায় সকল নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের যথাযথ মজুদ থাকার পরও হু হু করে দাম বাড়ছেই। এই করোনাকালীন মহামারীর সময়ে কর্মহীন অসহায় গরীব মানুষের গলায় যারা অমানবিক চড়া মূল্যের চুরি বসিয়েছে, তাদের দুইবেলা দুই মুঠো আহার কেড়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে, নিজে খাবো আর অন্য কাউকে খেতে দেব না বলে যারা এসব পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে; তারা কারোরই আপন হতে পারে না।

এসব ভয়ংকর সিন্ডিকেটকারী ও বড্ড বজ্জাত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থা করা না গেলে এমন অচলাবস্থার অবসান হবে না। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে বাজার তদারকি করে কিছুটা দাম কমানো গেলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আদালত চলাকালীন বাজার মূল্য ঠিক থাকলেও ম্যাজিষ্ট্রেট চলে যাওয়ার পর পরই আবার চরম উর্ধ্ব মূল্য চাপিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে। সরকার বাজার ব্যবস্থা স্থিতিশীল করার সব ধরনের সহযোগীতা সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পরও এ সমস্যার আশানুরূপ সমাধান আসেনি।

একটি দেশের সার্বিক উন্নতি নির্ভর করে, সে দেশের নাগরিকদের দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের মানদণ্ডের উপর। দেশের নাগরিকরা ভালো হলে, দেশপ্রেমিক হলে, অপরাধ কর্মে কম জড়ালে সংশ্লিষ্ট দেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌছুতে পারে। স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে সফলতার চূড়ায় পৌছা যায় সহজেই। পক্ষান্তরে দেশের অধিকাংশ মানুষ যদি দূর্নীতিগ্রস্ত হয়; চুরি করা, মানুষ ঠকানো, খুন করা তাদের প্রধান পেশা ও নেশায় পরিণত হয়, তাহলে সেদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন নয় শুধু বড্ড দুঃসাধ্য ব্যাপারও বটে।

দেশ পরিচালনাকারী সরকার আপনার চরিত্র ও বদ অভ্যাস বদলাতে পারবে না। আপনার খারাপ চরিত্রের মানসিকতার জন্য আপনি ধর্ষণ করেন, খুন করেন, চুরি করেন, দূর্নীতি করেন। আবার সমগোত্রীয় চোরদের সাথে এক হয়ে সিন্ডিকেটের করাত কলে সাধারণ মানুষকে জবাই করেন। কে বাঁচল কে মরল তা না ভেবে দূর্নীতির কালো টাকায় ব্যাংক ভরেন, বাড়ি করেন, দামী গাড়িতে চড়ে সমাজসেবক সাজেন।

কোথাও জ্যামে আটকে গেলে আপনার গাড়ির জানালায় সহায়হীন ভিক্ষুকরা হাত পাতলে ধাক্কা মেরে তাকে ফেলেও দেন। এটা আপনার নিজের দোষ, আপনার নিকৃষ্ট মানসিকতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। আপনাদের মত অমানুষদের অকস্মাৎ ধাক্কা সামলাতে না পেরে ওই সব ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষরা আরেকটা গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়। থেতলে যায় তার ক্ষুধার্ত শরীর। মানবতা তখন পিষে মরে পিচঢালা চওড়া কালো রাস্তায়। এসব নোংরা, পশুতুল্য ও নিকৃষ্ট মানসিকতার নিঃসীম নিষ্ঠুর অপরাধ কর্মে সরকারের কোনো দায় আছে? একদম নেই।

আমাদের দেশে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের দায় সরকারের নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তির বদ, নোংরা ও খারাপ মানসিকতার। এইযে ধরুন ধর্ষণ। এটা কি ব্যক্তির পশুসুলভ জিগাংসার নগ্ন আর্তনাদ নয়? এক্ষেত্রেও আমরা বড় পাল্লায় সরকারেরই দায় চাপিয়ে দিই। পণ্যদ্রব্যের উর্ধ্বগতি, ধর্ষণ, খুন, দূর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া মানুষের ভীড়ে এসব অপরাধে জড়িত অপরাধীরাও আছে। নিজে ধর্ষণ করছে অবলীলায়, কিন্তু আবার ধর্ষণের প্রতিবাদও করছে, লম্বা ব্যানার নিয়ে, প্লেকার্ড উঁচিয়ে রাস্তায় নেমেছে।

অপরাধীরা কারো বন্ধু নয়। তারা দেশ, সরকার ও জনগণসহ সবার দুশমন। এসব দুশমনদের কারণে দেশে আন্দোলন সংগ্রাম হয়, জনগণের জানমালের ক্ষতি হয়, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। আর তখন বেকায়দায় পড়ে সরকার। বিপদের সম্মুখীন হয় সাধারণ জনতা। দেশের জনগণ সুনাগরিক হলে, দেশের আইন মেনে চললে, অপরাধ কর্ম না করলে দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বেশি সময় লাগে না।

ধর্ষণ রুখতে দেশের জনগণের দাবী অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দণ্ডের বিধান রেখে আইন করেছে সরকার। এ আইন অনুযায়ী দেশে অতি অল্প সময়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে বিচার হচ্ছে আদালতে। কিছুদিন আগেও মাত্র সাত কর্মদিবসে একটি ধর্ষণ মামলার বিচার করেছে আদালত। দোষীকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে। ধর্ষণের মামলাগুলো সর্বোচ্চ ১৮০ দিনে শেষ করার বিধান রাখা হয়েছে। এই যে ধরুন ধর্ষণ রুখতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করা হয়েছে, এটা ভালো খবর। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক নিরপরাধ মানুষও মিথ্যা মামলার শিকার হচ্ছে।

কারাগারের নিষ্ঠুর দেয়ালে কান পাতলে শুনা যায়, অগণিত অজস্র নিরীহ নিরপরাধ মানুষ কোনো ধরনের অপরাধ না করেও সাজা ভোগ করছে। আমার এলাকায়ও এরকম একটি মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে। এক বাদিনী মিথ্যা ও বানোয়াট নারী নির্যাতন মামলা দিয়ে গ্রামের চারজন সহজ সরল ভালো মানুষকে হয়রানি করাচ্ছে। মামলার এজাহারে বর্ণিত কোনো ঘটনা গ্রামে ঘটনি। গ্রামের কেউ দেখেনি।

অথচ এমন একটি মিথ্যা মামলায় মানুষগুলোকে হয়রানি করা হচ্ছে। কোনো নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষ যেন মিথ্যা মামলার শিকার না হয়,সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী অফিসারকে বিষয়টি অতীব গুরুত্বের সাথে খেয়াল করতে হবে। দুই চার পয়সায় নিজের সততা বিকিয়ে দিয়ে মিথ্যা মামলায় মানুষ মারায় সহযোগিতা করা খুনের চেয়েও কম অপরাধ নয়।

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি সরকারকে অবশ্যই থামাতে হবে। একদিকে করোনার কারণে মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় কমে গেছে। অন্য দিকে পণ্যদ্রব্যের আকাশ ছোঁয়া উর্ধ্বগতি চলতে থাকলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার সাথে সাথে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। টাকার মূল্যমান কমে যাবে। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। করোনার সময় শুরু হওয়া ধর্ষণের মহামারি কিছুটা হলেও কমেছে। এজন্য যে, যমদূত কে সবাই ভয় করে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সরকারের আইন প্রণয়নের ফলে ধর্ষণের মত নিকৃষ্ট ও জঘন্য অপরাধটি আরো অনেকটাই কমে আসবে বলে আমরা আশা করতে পারি।

ধর্ষণের মত পণ্য মূল্যের উর্ধ্বগতি থামাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের অন্তত যাবজ্জীবন সাজার বিধান রেখে নতুন আইন করা গেলে, এটাও কমবে বলে আমরা মনে করি। কারণ অপরাধ বাড়ার প্রধান কারণ হলো-অপরাধীর বিচার না হওয়া। সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে খাদ্য সন্ত্রাসও রোধ করা সম্ভব।

আমরা আশা করি জাতির জনকের হীরক কন্যা দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্ষেত্রেও সফল হবেন। কঠিন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের যাদুকরী কারিশমায় বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই সফলতা লাভ করেছে। করোনাকালীন সময়ে সরকারের দেয়া নগদ প্রণোদনা আমাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। সব বাঁধা পায়ে দলে উন্নয়নের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছুক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। এমন প্রত্যাশা দেশের প্রতিটি সুনাগরিকের।

লেখকঃ কবি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *