‘সুশ্রীমুখে সোনা-হীরার মাস্ক’-আলাউদ্দিন আহমেদ

কালজয়ী ডেস্কঃ ‘অনৈতিকতার বোমা’ আতংকে সমাজের অসংখ্য শান্তিপ্রিয় মানুষ এখন আক্রান্ত। করোনা ভাইরাস যেমন সারাবিশ্বের মত বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করেছে, মানুষের আর্থিক ও সামাজিক বন্ধনে ভাঙ্গন সৃষ্টি করেছে; অন্যদিকে এই করোনাই নতুন করে অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে শিখিয়েছে।

অনেক নাজানা বিষয় উন্মোচিত হচ্ছে দফায় দফায়। দেশবাসী বিস্মিত। যারা সমাজে চলবে মাথা নিচু করে তারাই চলছে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে। রিজেন্ট হাসপাতালসহ রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে বহু ছবি দেশ-বিদেশে ভাইরাল হয়েছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। হেলথ সেক্টরের ভিতরের মহাদুর্নীতির যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে তা মানুষের মনে হতাশা তৈরি করছে। মিঠু নামের এক ঠিকাদার আমেরিকায় বসে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের নামে স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বত্র যন্ত্রপাতিসহ সব ধরনের জিনিসপত্র সরবরাহের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন করে। ইতোমধ্যে দুদক এ ধরনের ১৪টি প্রতিষ্ঠান কালো তালিকাভুক্ত করেছে। শত শত কোটি টাকা লোপাটের লাগামহীন চিত্র উঠে আসছে, মিডিয়ার মাধ্যমে দেখছে দেশবাসী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার হুঁশিয়ারিকেও এরা সহজে আমলে নিতে চাচ্ছেনা। তাহলে কতটা আধিপত্য বিস্তার করেছে এই লুটেরার দল। জিকে শামিম, পাপিয়া, পাপুল, খালেদ, সম্রাট, ডা. সাবরিনার মত অর্থলোভিরা কত সহজে দুর্নীতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে পৌঁছে যায় সেই চিত্র এখন ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র।

অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতার পর জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে ক্ষোভে-দু:খে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি আমি পেলাম চোরের খনি’। এসব কথা তিনি নিজ দলের অসৎ নেতা আর আমলাদের বিরুদ্ধেই বলেছিলেন। প্রায় অর্ধশত বছর বয়স হয়ে গেল বাংলাদেশের। আজকে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা দেশবাসীর আশা আকাংখার ভরসাস্থল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামীলীগের সকলকে কেনা যায়’। তাঁর নির্দেশে পাকড়াও হচ্ছে দলের লোকজনই যারা নানান কৌশলে দলের ভিতরে ঢুকে নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে লালিত-পালিত হয়ে দেশের উন্নয়নকে কুরেকুরে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। মাদকের নেশার মত দুর্নীতিও এদের কাছে ভয়াবহ নেশায় পরিনত হয়েছে। কোন কিছুতেই এদের থামানো যাচ্ছেনা। লুট করা অর্থ পাচার করছে বিদেশে। সুইচ ব্যাংকে জমানো এদের বিরাট অংকের টাকা সম্পর্কে ইতোমধ্যে অনেক তথ্য মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।

আমলাদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক নেতাদের সাথে মিলেমিশে দেদারসে অবৈধ অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছেন। এযেন হরিলুটের উৎসব চলছে। কে কার চেয়ে বেশি পারে তার প্রতিযোগিতা করছে ওরা। করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতাকে ওরা পুঁজি করেও অপকর্ম করছে। যেখানে মানুষের জীবনমরন সমস্যা সেখানেও ওই লুটেরা দুর্নীতিবাজরা থামছেনা।

রূপপুরের বালিশকান্ড থেকে শুরু করে বিস্ফোরিত দুর্নীতির চিত্র স্বাস্থ্যবিভাগকে কিভাবে পঙ্গু করে রেখেছে তা এখন দৃশ্যমান। কেন্দ্র থেকে মফস্বল কাকে দিয়ে কিভাবে কাজ করাবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেটাই চিন্তার বিষয়। তাঁর সততা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে শুধু করোনা ভাইরাস নয়, দলের দুর্নীতিবাজরাও ক্ষতিগ্রস্থ ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। অন্যদিকে এইসব দুর্নীতিবাজরা তাদের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ-সম্পদের দাপটে সমাজজীবনকেও কলুষিত করছে। সমাজের ও দলের ভাল মানুষ ও নেতাকর্মীরা এখন কোনঠাসা।

দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরলে অপব্যবহার হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের। মিডিয়াকর্মীরা নাজেহাল হচ্ছে, কয়েকজন বিশিষ্ট সাংবাদিক কারাগারে, অনেকের ভোগান্তি মামলায়। ব্যবসা, রাজনীতি, আইনের প্রয়োগ এখন ওইসব লুটেরাদের দখলে। তাদের অবৈধ অর্থের কাছে বিবেকবানরা বড়ই অসহায় হয়ে পড়ছে। অনৈতিকতার বোমাবাজরা কখন কার উপর চড়াও হবে বোঝা মুশকিল। এর প্রমান তো মাঝেমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি রিজেন্ট গ্রুপের মালিক সাহেদের ছবির এ্যালবাম দেখলে আর কিছু ভাবার অবকাশ থাকেনা। এরা এক-একজন ‘অনৈতিকতার বোমা’ নিয়ে সমাজে বিরাজ করছে।
শেষ পর্যন্ত কি হবে সাহেদদের-? যদি এদের গডফাদারদের কিছু না হয়, যদি শেকড় উপড়ানো না যায় তাহলে দুর্নীতি দমন করা আদৌ কি সম্ভব-? এক সাহেদ, সম্রাট, খালেদ, সাবরিনা, পাপিয়া যাবে আবার সেই জায়গা দখল করবে অন্য কেউ।

দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচার আর অবৈধ অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার কাজ শুরু করতে না পারলে এই মহিরূহ ভাঙ্গা কঠিন। এরা যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এইসব অপকর্ম করছেনা তার কি গ্যারান্টি-?। গায়ে মুজিবকোর্ট খন্দকার মুশতাকেরও ছিল। দলের নাম ভাঙ্গিয়ে যারা শতশত কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ গড়ে তুলেছে তারা তো প্রত্যেকেই খন্দকার মুশতাকের দোসর। এদের সংখ্যা তো বেড়ে চলেছে। আওয়ামীলীগের ত্যাগি প্রকৃত মুজিবপ্রেমি নেতাকর্মীরা কোনঠাসা হতে হতে এখন হারিয়ে যাওয়ার দশা হচ্ছে। দলে যারা তরুন তারা ভাল কিছু করতে চায়, কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা এগুতেই পারছেনা। তাদেরকে ব্যারিকেড করে রাখা হয়েছে। এ ধরনের কথাবার্তা তৃণমুলে ব্যাপক শোনা যায়।

সেইদিন গণমাধ্যমে দেখলাম করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরায় মুখের অনেকটা অংশই ঢেকে যাচ্ছে। তাই বিপরীত প্রান্তের মানুষটির নজর টানতে এমন কিছু করার ভাবনা থেকে ভারতের সুরাটের একটি গয়নার দোকানে তৈরি করা হয়েছে নজরকাড়া মাস্ক। হীরা বসানো সোনার তৈরি এই মাস্কের নাকি বেশ চাহিদাও তৈরি হয়েছে। মাস্কগুলোর দাম ভারতে দেড় লাখ রূপি থেকে চার লাখ রূপি।

বাংলাদেশে এই মাস্কের সম্ভবত চাহিদা আছে। কারণ আলোচিত ওইসব লুটেরা ও তাদের দোসররা দেশে টাকা খরচের জায়গা পায়না, পাচার করে বিদেশে। তাই তাদের বেগম সাহেবদের খুশি করার জন্য এই করোনা সংকটকালে সোনা-হীরার তৈরি মাস্ক অবশ্যই যথাযথ হতে পারে। সুন্দর মুখখানি দেখা না গেলেও সোনার তৈরি মুখোশ তো দেখা যাবে, এটাইবা কম কিসে!

( লেখকঃ ঈশ্বরদীর সিনিয়র মিডিয়াকর্মী ও কলামলেখক। সাবেক সভাপতি-ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব