অলীক স্বপ্ন নিরাপদ সড়ক শ্যামল শর্মা

সড়ক দুর্ঘটনা কতটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে, তা দেশের প্রতিদিনের দুর্ঘটনার চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। এটা খুবই দুঃখজনক যে, অনেক চেষ্টার পরও সড়কে নিরাপত্তা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে পারছে না সরকার। জোরালো অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর একচেটিয়া প্রাধান্যের কারণেই এই খাতে শৃঙ্খলা আসছে না। এছাড়া সরকার, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ফলে সিদ্ধান্ত হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। আইন আছে কিন্তু এর প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধা আসে। এর ফলে রক্ষা হচ্ছে না যাত্রীস্বার্থ। অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে সড়কে। অনেকে তা নিয়তি বলেই মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এটি যে নিছক নিয়তি নয় তা বোঝার বোধগম্য জ্ঞান আমাদের হয় না। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম গাড়ি ব্যবহার করেও সর্বাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ হতাহত হয় তা দেশের সবগুলো অপরাধী কর্মকান্ড মিলিয়েও হয় না। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাড়ি ব্যবহার করেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। আর সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে যুক্তরাজ্যে। প্রতিবছর বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় দেড় লক্ষাধিক প্রাণহানি হচ্ছে এবং আহত হচ্ছে আরও পাঁচ কোটি মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনায় আগে সর্বাধিক তালিকায় নাম ছিল নেপালের। নেপাল সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এখন দ্বিতীয় স্থানে চলে আসায় বাংলাদেশ প্রথম স্থানে চলে এসেছে। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে প্রতিবছর দেশের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির-২ শতাংশ। এক জরিপে দেখা যায় ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপানেও সড়ক দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু তার সংখ্যা কম। ভারতেও এর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। এর মূল কারণ, যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হয় সেগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সম্পর্কে অন্যান্য দেশের সরকার উদাসীন নয়। তারা এ কাজকে নিজেদের দায়িত্বের বাইরের বিষয় মনে করে না। বাংলাদেশে বছরের পর বছর নিরীহ যাত্রীরা যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং আহত হচ্ছে, তার থেকে অধিক সংখ্যায় অন্য, কোনভাবে জীবনের ক্ষতি হয় না, যদিও বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য হতাহতের সংখ্যাও অনেক। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করার বিষয়, সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু, বোমা হামলায় মৃত্যু নিয়ে যথার্থ কারণেই হৈ চৈ মিটিং-মিছিল হলেও সড়ক দুর্ঘটনায় যে হাজার হাজার মানুষ বছরে হতাহত হচ্ছে এ নিয়ে কোন মহলেই কোন উদ্বেগ দেখা যায় না। এর বিরুদ্ধে কোন মহল থেকেই কোন কার্যকর জোরাল প্রতিবাদ হয় না। হাজার হাজার নিরীহ লোকের এই মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও জীবনের সর্বনাশ একটি নীরব ব্যাপার হিসেবেই বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে ঘটে চলে। সংবাদপত্রে রিপোর্টের চেয়ে ছবির গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। আমাদের স্মরণে রাখা উচিৎ সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু ব্যক্তির জীবনহানিই ঘটে না, বরং পারিবারিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় ।
মূলত সড়ক দুর্ঘটনার কারণ: সড়ক দুর্ঘটনায় চালকরাই অনেকাংশে দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারন চালকের দায়িত্বহীনতা ও অনভিজ্ঞতা। কারণ গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে বা অন্য কারও সঙ্গে কথা বলা, ট্রাফিক আইন যথাযথ অনুসরণ না করা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গাড়ি চালানো, অতিদ্রত বা বেপরোয়া গাড়ি চালানো, নির্দিষ্ট গতিসীমা অনুসরণ না করা, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য পরিবহন, রোড সাইন, মার্কিং ও ট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে ধারণা না থাকা বা ধারণা থাকলেও সেগুলো মেনে না চলা, সড়ক ব্যবহারের নিয়মকানুন সম্পর্কে অজ্ঞতার পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারবিধি ও আইনের প্রতি উদাসীনতা ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব, বিপজ্জনকভাবে ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেক করার অসুস্থ প্রতিযোগিতা করা, সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা, গাড়ি চালানোর সময় মনোযোগ না দেয়া, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চালানো, চালকের পরিবর্তে
হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে অসচেতনভাবে গাড়ি চালানো, যথাসময়ে যথোপযুক্ত সঙ্কেত দিতে ব্যর্থতা, যথাযথ লেনে গাড়ি না চালানো, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না নিয়ে অবসাদগ্রস্থ অবস্থায় একটানা গাড়ি চালানো, নেশাগ্রস্থ অবস্থায় ও দৈহিক অযোগ্যতা নিয়ে গাড়ি চালানো ইত্যাদি। উপরিউক্ত কারনসমূহ সম্পর্কে অবগত থাকা সত্তে¡ও সংশ্লিষ্ট দফতর টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ চালকদের হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দিচ্ছে। এমনকি অপ্রাপ্ত বয়সের কিশোরদের হাতেও ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দেয়া হয়। এভাবেই প্রতিনিয়ত অযোগ্য ব্যক্তির হাতে মানুষ হত্যার লাইসেন্স তুলে দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, দেশের শতকরা ৭০ ভাগ ড্রাইভিং লাইসেন্স অবৈধ। এটাকে বলা হয় ‘দুই নম্বর’ লাইসেন্স। অবশ্য এই লাইসেন্স ইস্যু করা হয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ‘বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি’র পক্ষ থেকে। অর্থাৎ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই নিরবে দানবীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনার নৈপথ্যে মালিক পক্ষও কিছুটা দানবীয় ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন: নিয়মিত গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ না করা, যোগ্য ও অদক্ষ চালক নিয়োগ দেয়া এবং চালক ও কন্টাক্টর নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি অনুসরণ না করা, পরিবহন শ্রমিকদের ওপর মালিকের নিয়ন্ত্রণ না থাকা, অনুমোদিত ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অধিক পণ্য বা যাত্রী পরিবহনের জন্য চালক ও কন্টাক্টরকে নির্দেশ দেয়া, শ্রমিকদের দিয়ে অধিক পরিশ্রম করানো ও স্বল্প পারিশ্রমিক দেয়া, বেতনভিত্তিক চালক নিয়োগ না দিয়ে চুক্তিভিত্তিক চালক নিয়োগ দেয়া, শ্রমিকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করা, যাত্রা শুরুর আগে চালককে গন্তব্য স্থান সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত না করা, সময় নিয়ন্ত্রণ গাড়ি পরিচালনা পদ্ধতি অনুসরণ ও সময়ক্ষেপণ হলে জরিমানা করা, লাইসেন্স প্রদানে মালিক পক্ষের হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করা ইত্যাদি। সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি ও মামলায় আসামিদের শাস্তি না হওয়ার কারণ:
বাস-ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের চালকদের ইউনিফমের (স্বতন্ত্র পোশাক) ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চালকরা জনগণের পাকড়াওয়ের হাত থেকে অনায়াসেই রেহাই পেয়ে যায়। চালকদের মেডিকেল চেকআপের ব্যবস্থা ও বাধ্যবাধকতা না থাকায় শারীরিক ও মানসিকভাবে অযোগ্য অনেক গড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। চালকদের আইডি কার্ড (পরিচয়পত্র) না থাকায় দুর্ঘটনার পর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালকরা ড্রাইভিং লাইসেন্সে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে থাকে। ফলে ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে তাদের আর হদিস পাওয়া যায় না। বস্তুত দায়ী চালকের বিরুদ্ধে যদি কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা যেত, তাহলে অন্যরা সাবধান ও সতর্ক হতে পারত।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিকার হয় না, কারণ: সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার দায়ের করা মামলায় বাদী হয়ে থাকে পুলিশ। ট্রাফিক আইনানুযায়ী আসামি করা হয় গাড়ি ও তার চালককে। মামলায় পরোক্ষভাবে গাড়ির মালিককেও জড়ানো হয়। ফলে পুলিশ ও আসামিদের সমঝোতার ভিত্তিতেই থানাতেই অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যায়। আদালত পর্যন্ত কিছু মামলা গড়ালেও পুলিশ একে ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ফলে আসামিরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। আর ক্ষতিগ্রস্থের পরিবার এই মৃত্যুকে দৈব বা নিয়তি বলেই মেনে নেয়।
আসুন আমরা এই দানবীয় বলয় থেকে বেরিয়ে আসি। প্রত্যেকে সচেতন হই, আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা ও উদ্যোগই পারে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে। আমাদের মনে রাখা দরকার ‘ক্ষণিকের অসাবধানতা সারাজীবনের কান্না’।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, যশোর জেলা শাখা।